Sunday, January 18, 2026

পান সে পানসে নয়


আমার পানের দোকান ভালো লাগে। সিগারেট খাই না, মশলাপাতির দিকেও ঝোঁক নেই। মাঝেমধ্যে ওই মিষ্টিপান। কিন্তু এই পানদোকানের ভিড়ে গিয়ে দাঁড়ানো বেশ তৃপ্তির। এ চাইছে কলকাত্তা সাদা, ও চাইছে ফ্লেক। এ ফলাও করে বলছে জর্দার কোড তো এ চাইছে মশলা এলাচ। ব্যাস্ত পানওলা, আত্মবিশ্বাসী খদ্দেরের দল। আর চমনবাহার, গুলকন্দ, পানমশলার বাহারে সুবাস মাখানো বাতাসে সিগারেটের কড়া গন্ধ এসে মিশছে।

আমি দেখেছি, দুঁদে পানওলাদের আঙুল চলে অসাধারণ দ্রুততায় অথচ তাঁদের মুখ শান্ত ও নিস্পৃহ। মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না। এই মুগ্ধতার জেরে হপ্তায় খানদুয়েক মিষ্টিপান ঠেকানো যাচ্ছে না। পানদোকানের ভীড়ে আমারও যে একটা জরুরী ভূমিকা আছে, সে'টা বেশ টের পাচ্ছি।

Friday, January 16, 2026

ভালো কোয়ালিটির মনখারাপ

- বুঝলে ভাইটি , ভালো কোয়ালিটির মনখারাপ আজকাল আর সহজে দেখা যাচ্ছে না।
- মন খারাপের কোয়ালিটি? বিনোদবাবু, দু'পাত্তর চড়িয়েছি আমি, আর নেশাগ্রস্ত কথা বলছে আপনি।
- আহা, এই যে মুচমুছে বেগুনি, এর মধ্যে ইন্টক্সিক্যান্ট নেই বলছ? তবে আমারকথাটা তলিয়ে দেখো। যা দিনকাল পড়েছে, মনখারাপকে যে একটু নারচার করবে তার উপায় নেই।
- মনখারাপ, তার আবার নারচার। তার আবার কোয়ালিটি।
- ও মা। গামছা আর ন্যাতা কি এক হলো?
- মনখারাপ ব্যাপারটাই তো নেগেটিভ।
- এই যে সুরাপান করছ ভায়া, সবই জলে যাচ্ছে। মনখারাপ যদি অত নেগেটিভই হবে তবে সঙ্গীত সাহিত্য সবই মিছে। তবে ওই, মনখারাপ হাই কোয়ালিটির না হলে সবই মাটি। আর সে'খানেই বিস্তর সমস্যা বুঝলে। এত ভেজাল চাদ্দিকে।
- ভেজাল কী'রকম?
- এই ধরো একটা নধর মনখারাপের কারণ পাওয়া গেল। সে'টাকে খেলিয়ে খেলিয়ে চোখে ছলছল ভাব আনতে হবে। ভ্যাঁ ভ্যাঁ মার্কা বেহেড কান্না নয়, ভারি শ্যামল মিত্র লেভেলের ছলছল হতে হবে বুঝলে। দুঃখের ডিস্কো ব্যাপারটা বড্ড লাউড। আমার বুকে তা'তে চোট লাগে। ওই যা বলছিলাম, শ্যামল মিত্রয়েস্ক ছলছল দরকার। একটু আধো-অন্ধকারের খোঁজ করতে হবে। তা'ছাড়া, দেখবে মনখারাপের কোয়ালিটি ভালো হলে সঙ্গীতবোধ আপনা থেকেই ধারালো হয়ে যায়। সে'টাই নিয়ম। আর সবচেয়ে বড় কথা, জেনুইন মনখারাপগ্রস্ত মানুষ কখনো ছেঁদো কথার দিকে ঘেঁষতে পারে না। যা কিছু গভীর, যা কিছু সুন্দর; সে'দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া তাঁর কোন উপায় নেই। তাই বলছিলাম, মনখারাপ টের পেলে সে মনখারাপের মাথায় হাত বুলিয়ে ম্যানেজ করতে হয়। তাকে চাবকে সিধে করতে চাইলেই সমস্যা।
- কী'রকম সমস্যা?
- ওই, মনকেমনকে সামাল না দিতে পারলে ছলছলের বদলে বিরক্তি ও বিরক্তির পর জমাট রাগ। দুঃখকে ডিসিপ্লিন না করতে পারলে সে বাবাজি মাথায় উঠে নাচতে শুরু করে। সেই আগডুমবাগডুমে ছলছল খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেখানে সঙ্গীত মিইয়ে যায়, সাহিত্য শুকিয়ে যায়। মনখারাপের সে এক বিশ্রী ওয়েস্টেজ।
- ওয়েস্টেজ ব্যাপারটা খুবই খারাপ।
- খুবই খারাপ ভায়া। খুবই খারাপ। ভালো একটু মনখারাপ যদি গ্রিপ করতে পারতাম ভাইটি, উতরে যেতাম।

ঝুনুর বাবা, মান্তুর বোন

- ঝুনু? এসেছিস?
- উফ! বাইরে কী বৃষ্টি পিসি।
- ভিজে গেছিস নিশ্চয়ই!
- ভিজে কাক। তোমার গামছাটা নিলাম।
- দেখতে পাই না তো কী, ঝমঝম শুনছি কখন থেকে আর ভাবছি আজ নির্ঘাত ঝুনু ভিজেটিজে আসবে।
- শ্যামলীর মাকে বলছিলে তো ওঁর সেই স্পেশ্যাল বাটিচচড়িটা করতে?
- দ্যাখ না, ঢাকা দেওয়া আছে টেবিলে। আর পাবদার ঝাল, তুই আসবি শুনে সে নিজেই নিয়ে এসেছিলো।
- বহুত খুব। তবে তুমি আবার উঠতে যেও না। আমিই বেড়ে নেবো।
- হ্যাঁ রে, মান্তু বলছিল তোর ছুটি বাতিল হয়ে গেছে?
- বাবা ইতিমধ্যেই সে কথা জানিয়ে দিয়েছে?
- মা মরা ছেলে, ঝুনু তোকে চোখে হারায়।
- সে সিম্পটম তো দেখি না। যখনই দেখা হয় কেমন একটা খ্যাঁকখ্যাঁকে মেজাজ।
- সে ওর ধাঁচই তেমন। তা হ্যাঁ রে, তোর ছুটি বাতিল কেন হল?
- বর্ডারে কিছু আনরেস্ট, তাই আর কী...।
- যুদ্ধটুদ্ধ লাগবে নাকি? খবরে তো রোজই দুঃসংবাদই শুনি।
- কেন দ্যাখো ও'সব। তার চেয়ে তোমার বাংলা সিরিয়ালগুলোই ভালো। বাহ্‌, চচ্চড়িতে আজ বেড়ে ঝাল দিয়েছে তো শ্যামলীর মা।
- নিশ্চয়ই হাত না ধুয়েই লেগে পড়েছিস।
- বৃষ্টিতে ভিজলাম তো।
- ঝুনু, বাবাকে ফোন করিস নিয়মিত। কেমন?
- তোমায় ফোন করতে বললে না তো?
- বাপটাকে একটু দেখিস, মান্তুর যত হেডমাস্টারি সব হাবেভাবে, তোর ব্যাপারে ও আদতে কিন্তু ভারি নার্ভাস।
- বাবা? নার্ভাস? হাসালে পিসি।
- ফোন করিস মান্তুকে। কেমন?
- বাবাকে তুমি প্যাম্পার করেছ চিরকাল। অথচ বাবা তোমার সেই স্নেহ-ফেহকে কখনই পাত্তা দেয়নি।
- ডেঁপোমি না করে আমি যা বলছি মনে রাখিস। হপ্তায় অন্তত দু'বার কল করিস বাবাকে। আমায় রোজ রোজ ফোন করে বাজে খেজুর না করলেও চলবে।
- তোমার কথা শুনলে মাঝেমধ্যে মনে হয় তুমি বাবার দিদি না, মা। এত বায়াসড যে কেউ হতে পারে মাইরি পিসি...।
- দেখতে পাই না, হাঁটাচলার শক্তিও প্রায় গেছে বললেই চলে। ওই যে বায়াস না কি বললি, ওটাই আমার শক্তি। ওঁর জন্যেই টিকে আছি। ওই বায়াসই আমার চোখের দৃষ্টি, আমার হাঁটুর জোর।
- তা এত যে চিন্তা তোমার ভাইয়ের জন্য, সে কতবার তোমার খোঁজ করতে আসে?
- সে হিসবে করলে কি আর বায়াসড হতাম রে ঝুনু? সে বায়াস না থাকলে টিকে থাকতাম কী নিয়ে?
- পাবদাটাও টেরিফিক।
- চারটে মাছ আছে। সবকটা খাবি।
- পিসি, তোমার টিফিন বাক্স একটা দিও। একটা বাবার জন্য নিয়ে যাব।
- যাস।
- পিসি, ফোন কিন্তু তোমাকেই বেশি করবো।
- সে কি আর আমি জানি না?

মনমোহিনীর জানালা


মনমোহিনীর জানালার সঙ্গে সম্পর্কটা বড় মজবুত। এমনিতে হাবেভাবে সে বড়ই চঞ্চল, দুদ্দাড় করে গোটা বাড়ি মাথায় তুলছে। এই খামোখা উৎসাহে লাফাচ্ছে, তো এই অকারণ আনন্দে গড়াগড়ি যাচ্ছে।

কিন্তু সে'টা তার বাইরের পরত। নিপাট শান্ত ভিতরটা বেরিয়ে আসে সে যখন জানালার পাশে এসে বসে। তখন সে নরম। মধুবাবু কাছে এসে বসলে সে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখবে, ওই একটা "এসেছ? এসো" ভাব। তারপর ফের জানালার বাইরে চোখ। গাছের পাতার ঝিরঝিরে মুভমেন্ট যে চোখের জন্য এত মোলায়েম সে'টা মধুবাবুকে শিখিয়েছে মনমোহিনী। দেওয়াল বেয়ে পিঁপড়েদের হেঁটে যাওয়াও যে এত 'সুদিং', সে'টা মধুবাবু এদ্দিনে বুঝতে পেরেছেন। নীচের দিকে তাকালে দেখা যায় উঠোনে ছেলেমেয়েদের ছুটোছুটি, অদূরে রাস্তায় মানুষজনের হেঁটে যাওয়া। দু'মিনিট দেখলে মনে হয় সমস্তটাই এলোমেলো, র্যান্ডম। মিনিট দশেক সে'দিকে তাকিয়ে থাকলে বিরক্তি আসে। কিন্তু একটানা মিনিট কুড়ি তাকিয়ে থাকার পর মনের মধ্যে প্যাটার্নটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে; অতি র্যান্ডম দুনিয়ায় প্যাটার্ন চিনতে পারার মত আরামদায়ক ব্যাপার খুব কমই আছে। সে আরাম মধুবাবু চিনেছেন জানালাপ্রেমি মনমোহিনীর থেকে।

বাড়ির এই জানালাটার একটা নাম রেখেছেন মধুবাবু; "নেটফ্লিক্স"।

স্বপ্নরীল

স্বপ্নে দেখলাম আমাদের স্বপ্ন ডাইরেক্টলি টেনে নিয়ে রীল হিসেবে প্রকাশ করছে ফেসবুক। আর হয়েছে কী; আমার একটা মামলেট বানানোর স্বপ্ন রীল ট্রাম্পের সমস্ত রীলের চেয়ে বেশি লাইক পেয়েছে। তারপর যা হওয়ার তাই হয়েছে, ট্রাম্প সোফাসমেত আমায় ওয়াশিংটনে তুলে নিয়ে গেছে।

"কী ব্যাপার ভাইটি, এমন রাষ্ট্রবিরোধী স্বপ্ন দেখার তুমি সাহস পেলে কী করে"? স্পষ্ট বাংলা। যা শুনে স্বপ্নের আমি তো থ, "চুপ করে থাকলে পার পাবে না। চটপট জবাব দাও"।

"আমি তো আমেরিকার সিটিজেন নই স্যার। কাজেই আমার স্বপ্ন আপনার রাষ্ট্রবিরোধী হতে পারে না"।

"ওই কে কোথায় আছিস এ ব্যাটার দেশকে আমাদের বাহাত্তর নম্বর রাজ্য হিসেবে জুড়ে দে। দিয়েছিস? দিয়েছিস তো? ভেরি গুড। হ্যাঁ, কী বলছিলে"?

"বলছিলাম মামলেট রাষ্ট্রবিরোধী কেন"?

"রবীন্দ্রনাথ কি মামলেট খেতেন"? স্পষ্ট উৎপল দত্তের কণ্ঠস্বর নকল করে বললেন, আমি রবি ঘোষের মত বিব্রত হলাম।

"রবীন্দ্রনাথকে তো আপনি গত পরশু ব্যান করেছিলেন আপনার থেকে একটা নোবেল বেশি পাওয়ার অপরাধে। অতএব তাঁর মামলেট খাওয়া না খাওয়ায় কী এসে যায় বলুন"।

"এই কে কোথায় আছিস। একে মিউট কর"। মার্কিন টেকনোলজির বহর দেখে আমি তো হতবাক, সত্যিই কথা বন্ধ হয়ে গেল আড়ালে কেউ কোনো সুইচ টেপায়।

"হ্যাঁ, যা বলছিলাম", ট্রাম্প বলা শুরু করলেন, "এই যে তুমি আমার হাতে-পায়ে ধরে এতক্ষণ কান্নাকাটি করলে তাতে আমার মন গলেছে"।

আমি প্রতিবাদে মাথা নাড়তে গেলাম। টের পেলাম মাথা-ঘাড়ও মিউট করে দিয়েছে। কোথায় লাগে চীনের টেকনোলজি।

"আর এই যে তুমি তোমার স্বপ্নগুলো আমায় সতেরোটাকায় বেচে দিতে চেয়ে অনুরোধ উপরোধ করছ, তা'তে আমি আর না বলতে পারছি না"।

আমি হাত পা নেড়ে প্রতিবাদ করতে গেলাম। টের পেলাম গোটা শরীর অবশ।

"জানো", ট্রাম্প বেশ ইয়ারদোস্তির সুরে বললেন, "গতকাল আমি বাংলায় একটা গান লিখে পোস্ট করলাম। জীবনে কী পাব না, ভুলেছি সে ভাবনা। আড়াই কোটি লাইক এলো আড়াই সেকেন্ডে। বিউটিফুল না? যাক গে , শোনো। আমায় না বলে তুমি আর স্বপ্ন দেখো না, কেমন"?

বাহাত্তর বার না বলার চেষ্টা করলাম অথচ গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। কিন্তু যেই বলতে চাইলাম "তাই হবে স্যার", আমার গলা বেয়ে বাহান্নটা অমিতাভ বচ্চনের কণ্ঠস্বর বেরিয়ে এলো।